এপিলেপসি (Epilepsy) হলো মস্তিষ্কের একটি দীর্ঘমেয়াদি, অসংক্রামক রোগ, যা বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) মানুষকে প্রভাবিত করে। এই রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পুনঃপুন খিঁচুনি (seizure), যা স্বল্পস্থায়ী অনৈচ্ছিক নড়াচড়ার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। খিঁচুনি শরীরের কোনো একটি অংশে (আংশিক) অথবা পুরো শরীরে (জেনারালাইজড) হতে পারে এবং অনেক সময় চেতনা হারানো ও মল-মূত্র নিয়ন্ত্রণ হারানোর সঙ্গে যুক্ত থাকে।একবার খিঁচুনি হওয়া মানেই এপিলেপসি নয় (বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০% মানুষের জীবনে অন্তত একবার খিঁচুনি হতে পারে)। এপিলেপসি নির্ণয় করা হয় যখন কোনো ব্যক্তি দুই বা তার বেশি অনুপ্ররোচিত (unprovoked) খিঁচুনিতে আক্রান্ত হন।
এপিলেপসি বিশ্বের প্রাচীনতম পরিচিত রোগগুলোর একটি; এর লিখিত বিবরণ খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ সাল পর্যন্ত পাওয়া যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভয়, ভুল ধারণা, বৈষম্য ও সামাজিক কলঙ্ক এই রোগকে ঘিরে রয়েছে। আজও অনেক দেশে এই কলঙ্ক বিদ্যমান, যা রোগী ও তাদের পরিবারের জীবনমানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।লক্ষণ ও উপসর্গ (Signs and Symptoms)
খিঁচুনির বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে—
মস্তিষ্কের কোন অংশে প্রথম অস্বাভাবিক কার্যকলাপ শুরু হয়েছে
এবং তা কতটা বিস্তার লাভ করেছে
সাময়িক উপসর্গগুলোর মধ্যে থাকতে পারে—
চেতনা বা সচেতনতা হারানো
নড়াচড়ার সমস্যা
অনুভূতির পরিবর্তন (দৃষ্টি, শ্রবণ ও স্বাদসহ)
মুড বা অন্যান্য জ্ঞানীয় কার্যকলাপের পরিবর্তন
এপিলেপসি আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বেশি থাকে, যেমন খিঁচুনিজনিত পড়ে যাওয়া থেকে হাড় ভাঙা বা আঘাত। পাশাপাশি মানসিক সমস্যার হারও বেশি, বিশেষ করে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা।
এপিলেপসি আক্রান্ত ব্যক্তিদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি, এবং এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এবং গ্রামীণ এলাকায়।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এপিলেপসি-সম্পর্কিত অনেক মৃত্যুর কারণ প্রতিরোধযোগ্য, যেমন—
পড়ে যাওয়া
পানিতে ডুবে যাওয়া
পুড়ে যাওয়া
দীর্ঘস্থায়ী খিঁচুনি
রোগের বিস্তার (Rates of Disease)
এপিলেপসি বিশ্বব্যাপী রোগের বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা প্রায় ৫ কোটি মানুষকে প্রভাবিত করে। যেকোনো সময়ে সক্রিয় এপিলেপসি (চলমান খিঁচুনি বা চিকিৎসার প্রয়োজন) আক্রান্ত মানুষের হার প্রতি ১,০০০ জনে প্রায় ৪–১০ জন।
বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর আনুমানিক ৫০ লক্ষ (৫ মিলিয়ন) মানুষ নতুনভাবে এপিলেপসিতে আক্রান্ত হন।
উচ্চ আয়ের দেশে প্রতি বছর প্রতি ১,০০,০০০ জনে প্রায় ৪৯ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এই হার বেড়ে প্রতি ১,০০,০০০ জনে প্রায় ১৩৯ জন পর্যন্ত হতে পারে
এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ম্যালেরিয়া ও নিউরোসিস্টিসারকোসিসের মতো স্থানীয় রোগ
সড়ক দুর্ঘটনার হার বেশি হওয়া
জন্মকালীন আঘাত
চিকিৎসা অবকাঠামো ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা
বিশ্বের প্রায় ৮০% এপিলেপসি আক্রান্ত মানুষ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করেন।
কারণ (Causes)
এপিলেপসি ছোঁয়াচে নয়। যদিও বিভিন্ন রোগগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এপিলেপসি হতে পারে, তবুও বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫০% ক্ষেত্রে সঠিক কারণ অজানা।
এপিলেপসির কারণগুলোকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা হয়:
স্ট্রাকচারাল
জেনেটিক
সংক্রামক
মেটাবলিক
ইমিউন
অজানা
উদাহরণসমূহ—
গর্ভকালীন বা জন্মকালীন মস্তিষ্কের ক্ষতি (যেমন জন্মের সময় অক্সিজেনের অভাব, আঘাত, কম জন্ম ওজন)
জন্মগত ত্রুটি বা জেনেটিক রোগজনিত মস্তিষ্কের গঠনগত সমস্যা
গুরুতর মাথায় আঘাত
স্ট্রোক
মস্তিষ্কের সংক্রমণ (মেনিনজাইটিস, এনসেফালাইটিস, নিউরোসিস্টিসারকোসিস)
কিছু জেনেটিক সিনড্রোম
মস্তিষ্কের টিউমার
চিকিৎসা (Treatment)
খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। উপযুক্ত অ্যান্টিসিজার (antiepileptic) ওষুধ ব্যবহারে প্রায় ৭০% রোগী খিঁচুনি-মুক্ত জীবনযাপন করতে পারেন।
২ বছর খিঁচুনি না হলে ওষুধ বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে এতে ক্লিনিক্যাল, সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হয়। খিঁচুনি পুনরাবৃত্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস হলো—
খিঁচুনির নির্দিষ্ট কারণ জানা থাকা
অস্বাভাবিক EEG ফলাফল
নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৭৫% এপিলেপসি রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান না, যাকে বলা হয় “ট্রিটমেন্ট গ্যাপ”।
অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে অ্যান্টিসিজার ওষুধের প্রাপ্যতা কম। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি খাতে জেনেরিক অ্যান্টিসিজার ওষুধের গড় প্রাপ্যতা ৫০%-এরও কম।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়েই অধিকাংশ এপিলেপসি রোগীর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সম্ভব, উন্নত যন্ত্রপাতি ছাড়াই। WHO-এর পাইলট প্রকল্পগুলো দেখিয়েছে যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিলে চিকিৎসার ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।
যেসব রোগী ওষুধে সাড়া দেন না, তাদের ক্ষেত্রে সার্জারি উপকারী হতে পারে।
প্রতিরোধ (Prevention)
প্রায় ২৫% এপিলেপসি প্রতিরোধযোগ্য।
প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে—
মাথায় আঘাত প্রতিরোধ (পড়ে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা ও খেলাধুলাজনিত আঘাত কমানো)
উন্নত প্রসবকালীন সেবা
জ্বরাক্রান্ত শিশুর শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ
স্ট্রোক প্রতিরোধে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ
তামাক ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল পরিহার
কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধ, বিশেষ করে নিউরোসিস্টিসারকোসিস
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব (Social and Economic Impacts)
এপিলেপসি বৈশ্বিক রোগের বোঝার ০.৫%-এর বেশি দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে অকাল মৃত্যুজনিত জীবনহানি এবং অসুস্থ অবস্থায় কাটানো সময়। এই রোগের কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস ও অকাল মৃত্যু থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ভারতের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি অর্থায়নে চিকিৎসা ব্যয় বহন করলে পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ কমে এবং এটি ব্যয়-কার্যকর। এপিলেপসি আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই—
শিক্ষা গ্রহণের সুযোগে বাধার সম্মুখীন হন
ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে বঞ্চিত হন
নির্দিষ্ট পেশায় প্রবেশে বাধা পান
স্বাস্থ্য ও জীবন বিমার সুযোগ কম পান
অনেক দেশে এখনো এমন আইন রয়েছে, যা শতাব্দীপ্রাচীন ভুল ধারণার প্রতিফলন—যেমন এপিলেপসির কারণে বিয়ে বাতিলের বিধান বা খিঁচুনি আক্রান্ত ব্যক্তিদের জনসমাগমস্থলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা।