মাথাব্যাথা ও মাইগ্রেন

মাথাব্যাথা একটি সাধারণ উপসর্গ যা বিভিন্ন অসুখের কারণে হতে পারে। আমরা প্রত্যেকেই কোন না কোন সময় মাথা ব্যাথায় ভুগি। অনিদ্রা, দুঃশ্চিন্তা অতিরিক্ত কাজের চাপ, দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকা ইত্যাদি কারণে মাথাব্যাথাহতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে এর দায়িত্ব কম এবং তা এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।
আবার জ্বর সর্দি-কাশি এসব ভাইরাস জনিত রোগ আমরা মাথাব্যথায় আক্রান্ত হতে পারি, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী নয়। বিভিন্ন কারনে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র মাথাব্যাথাহতে পারে যা আমাদের দৈনন্দিন কাজকে ব্যাহত করে । তাই মাথা ব্যাথার চিকিৎসা করা প্রয়োজন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়মিত ওষুধ খেলে ও মিয়ম কানুন মেনে চললে মাথাব্যাথা ভালো হয়ে যায় ।,মাথা ব্যথার চিকিৎসা একটি প্রধান দিক হচ্ছে এর কারণ নির্ণয় করা। সঠিকভাবে রোগীর ইতিহাস নিয়ে ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে তা সম্ভব।
মাথা ব্যাথার অনেক কারন রয়েছে। তবে শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে আমরা মাথাব্যাথা কারণ হচ্ছে “প্রাইমারি হেডেক” যা দীর্ঘস্থায়ী এবং পূনঃ পূনঃ দেখা যায় এবং যা দেহের কোন মারাত্তক ক্ষতি করে না। নিয়মিত ঔষধ খেলে এবং নিয়ম মেনে চললে তা ভাল হয়ে যায় বা অনেকংশে কমে যায় এবং রোগী স্বাভাবিক জীবন জাপন করতে পারেন।
কিন্তু শতকরা ১০ জন রোগির ক্ষেত্রে মস্তিকের জটিল রোগের কারণ হতে পারে। এর প্রধান কারন হচ্ছে স্ট্রোক (হেমোরেজিক / সাবআয়াকনোরেড)মেনিনজাইট্রিস, মস্তিকে টিউমার ইত্যাদি কারন।এক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা করার প্রয়োজন অন্যথায় রোগীর অজ্ঞান হওয়া, খিচুনী হওয়া এবং নানাবিধ স্নায়ুবিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
প্রাইমারি হেডেক” যা শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট কারন খুজে পাওয়া যায় না। যথাযথ ঔষধ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেকংশে নিরাময় সম্ভাব। এর মধ্যে রয়েছে

(১) টেনশন জনিত মাথাব্যাথা বা টেনশন হেডেক ৮০ ভাগ।
(২)মাইগ্রেন জনিত মাথাব্যাথা ১৫ -২০ ভাগ।
(৩) ক্লাষ্টার হেডেক ০.১ ভাগ।

আজকে আমরা “মাইগ্রেন” জনিত মাথা ব্যাথা নিয়ে আলোচনা করব।
সেকেন্ডারি হেডেক নানা জটিল কারণে হতে পারে যেমন মেনিনজাইটিস, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, মস্তিষ্কের টিউমার, মস্তিষ্কে আঘাত ইত্যাদি ।
মাইগ্রেনঃ
এটি মস্তিষ্কের একটি জটিল সমস্যা। দীর্ঘস্থায়ী মাথা ব্যাথা যাদের রয়েছে তাদের মধ্যে অনেকেই এই মাইগ্রেন জনিত মাথা ব্যথায় আক্রান্ত। তবে এই রোগের মহিলা, পুরুষের তুলনায় বেশি আক্রান্ত হন (মহিলাদের আক্রান্ত হার প্রায় তিনগুণ বেশি) ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে এই রোগ বেশি পরিলক্ষিত হয়।
লক্ষণ সসূহঃ

প্রায় মাথা ব্যাথা।

৪ ঘন্টা থেকে ৭২ ঘন্টা স্থায়ী মাথা ব্যাথা।

মাথায় এক মাসে বার বার ব্যাথা করা।

মাথার পাশে ধপ ধপ করে লাফানো।

যে কোন শারীরিক পরিশ্রমে বৃদ্ধি পায়।

বমি ভাব/বমি করা ও শব্দ না শুন্তে পারা।

ক্ষেত্রে চোখে ঝাপসা দেখা বা জিকজ্যাক দেখা।

শব্দ ও আলোতে অতিসংবেদনশীলতা ।

এই সকল লক্ষণ সাধারণত একজনের নাও থাকতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এক পাশে তীব্র মাথা ব্যথার করে । তাই মাইগ্রেনের ডায়াগনোসিস এর জন্য সঠিক ভাবে রোগীর ইতিহাস নিরূপণ করা খুবই জরুরী।
যেসব কারণে মাইগ্রন অ্যাটাক বাড়তে পারেঃ

খাবারের মধ্যে অতিরিক্ত চকলেট, চীজ এবং অ্যালকোহল মাইগ্রেন জনিত মাথাব্যাথা কে বাড়াতে পারে।

খাদ্যে ব্যবহৃত টেস্টি সল্ট

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও অনিদ্রা

তাছাড়া মাসিকের সময় অনেক মহিলাদের মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়তে পারে।

রোদ বা উচ্চশব্দে অনেকের মাইগ্রেন বাড়ায় পারে।

মাইগ্রেন কেন হয়ঃ

মাইগ্রেনের কোন নির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা এর বেশ কয়েকটি মতবাদ
প্রকাশ করেছেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে “নিউরোভাসকুন্দার” থিওরি মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের ট্রাইজেমিনাল নিউক্লিয়াস নামে একটি অতিসংবেদনশীল জায়গা আছে। যা বিভিন্ন কারণে উদ্দেপিত হয়ে এক ধরনের কেমিক্যাল বা নিউরোট্রান্সমিটার রিলিজ করে (CGRP, Substance P)। এইসব নিউরোট্রান্সমিটার তখন রক্তনালীকে প্রসারিত করে এবং এক প্রকার প্রদাহের সৃষ্টি করে যা মাইগ্রেন মাথাব্যাথা জন্য অন্যতম কারণ। এছাড়া কিছু কিছু জেনেটিক কারণ রয়েছে। তাই এই রোগ অনেকের দেখা যায় বিজ্ঞানীরা এই সকল বিষয় নিয়ে প্রচুর গবেষণা করছেন এবং তার আলোকে ওষুধ তৈরির চেষ্টা করছেন।
মাইগ্রেনের বর্তমান চিকিৎসাঃ
১/ নন ফার্মাচলজিক্যাল চিকিৎসা বা ওষুধ ছাড়া চিকিৎসাঃ
>এক্ষেত্রে জীবনযাপন ব্যবস্থাপনা শরীরচর্চা ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা প্রধান কাজ।
>তাছাড়াও পর্যাপ্ত ঘুম, অতিরিক্ত টেনশন না করা ও যেসব কাজে মাইগ্রেন বাড়তে পারে তা থেকে বিরত থাকলে মাইগ্রেনের ব্যথা কমে যেতে পারে
>অনেকে এই ইয়োগা বা মেডিটেশন এর ধারন ও মাইগ্রেনের যন্ত্রণা করে অনেক মুক্ত হয়েছেন।
২/ ফার্মাচলজিক্যাল চিকিৎসাঃ

প্রতিরোধ চিকিৎসাঃ এক্ষেত্রে কিছু ঔষধ দীর্ঘদিন খেতে হয় এবং তা দীর্ঘদিন দমন থাকে অথবা সম্পুর্ন ভাল হয়।

তাতক্ষনিক চিকিৎসাঃ এক্ষেত্রে কিছু ব্যাথানাস্ক ঔষধ এবং ট্রিপটান জাতীয় ঔষধ অতি সাবধনাতার সাথে দেঔয়া যায়।

মাইগ্রেন এর আধুনিক চিকিৎসাঃ

১) নিউরোমডিঔলেটর থেরাপিঃ “সুপরাঅরবিন্টালনার্ভ” কউমুলেটর এটি একটি ছোট যন্ত্র যা মাথার সামনে 20 মিনিট ব্যবহার করলে ধীরে ধীরে তীব্র মাথাব্যাথাকমে যায়।
তবে এটা সবার জন্য নয়, যারা ওষুধ খেতে পারেন না তারাই এটা উপকৃত হন।
২/ অ্যন্টি CGRP থেরাপিঃ
এটি একটি মোনোক্লোনাল এ্যন্টিবডি যা বর্তমানে উন্নত বিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে যা মাইগ্রেন সৃষ্টিকারী নিউরট্রনস্মিশন কে বাধা দেয় এবং মাইগ্রেনের প্রশ্মিত করে।
পারে সর্বশেষ একটা কথা বলা প্রয়োজন যে মাথাব্যাথা সবসময় মাইগ্রেনের কারণে নাও হতে পারে। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই পরীক্ষার মাধ্যমে তা নির্ণয় করতে হবে।
এক্ষেত্রে এম আর আই করলে দ্রুত মাথা ব্যথার কারণ নির্ণয় করা যাবে এবং সেভাবে চিকিৎসা শুরু করা যা।

ডাঃ মোহাম্মদ আফতাব হালিম
এম,বি,বি,এস; এম, ডি, (নিউরোমেডিসিন); এম, এস, সি, (ইউ, কে)
কনসালটেন্ট নিউরোমেডিসিন
বি,আর,বি হাসপাতাল, পান্থপথ, ঢাকা।