স্ট্রোক মস্তিষ্কের রক্তনালীর একটি জটিল রোগ যা মস্তিষ্কের রক্তনালীর রক্ত চলাচলে হঠাৎ করে বাঁধা অথবা রক্তনালী ফেটে ক্ষরণের ফলে হতে পারে
স্ট্রোক এর ভয়াবহতা
স্ট্রোক একটি অতি মারাত্মক রোগ। এটি বর্তমানে সারা বিশ্বের দ্বিতীয় তম মৃত্যুর কারণ। প্রতি ২ সেকেন্ডে সারাবিশ্বে কোথাও না কোথাও স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন।
প্রতি ৬ সেকেন্ডে স্ট্রোকজনিত কারণে একজন রোগী মারা যাচ্ছেন
সারাবিশ্বে প্রায় ১৭ মিলিয়ন মানুষ প্রতিবছর
স্ট্রোক এ আক্রান্ত হচ্ছে এবং এর মধ্যে ৬.৫মিলিয়ন মারা যান এবং প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়েন যা একটি সামাজিক তথা দেশের জন্য বোঝা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
স্ট্রোক এর ধরনঃ
সাধারণত স্ট্রোক দুই ধরনের-
(১) ইসকিমিক স্ট্রোকঃ
মস্তিকের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যে স্ট্রোক হয় তাকে ইসকিমিক স্ট্রোক বলে। যা (৮৫%) শতকরা ৮৫ জনের ক্ষেত্রে স্ট্রোক মুল কারণ।
(২) হেমোরেজিক স্ট্রোকঃ
মস্তিকের রক্তনালী ফেটে রক্তক্ষরণের ফলে যে স্ট্রোক হয় তাকে হেমোরেজিক স্ট্রোক বলে যা ১৫% রোগীর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
(৩) টি আইএ (মিনি স্ট্রোক ) – এটি এক ধরনের ইসকিমিক স্ট্রোক যেখানে রোগী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পুর্ন সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু পরবতিতে বড় ধরনের ইসকিমিক স্ট্রোক হইয়ার ঝুকি থাকে।
স্ট্রোকের প্রধান উপসর্গগুলো কি কিঃ
(১) F(face) হঠাৎ করে মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া।
(২) A (Arm) হঠাৎ করে এক হাত বা পা ভারী হয়ে যাওয়া।
(৩) S (Spech) কথা জড়িয়ে যাওয়া।
(৪) T (Time) দূরত্ব কল করুন-৯৯৯
এছাড়াও মাথা ঘোরা, হঠাৎ করে চোখে না দেখা, ভারসাম্যহীনতা, অবশ লাগা একপাশ এবং এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়া পর্যন্ত হতে পারে।
স্ট্রোকের ঝুঁকিঃ
বিভিন্ন কারনে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শরীরগত, জ্বীনগত, পরিবেশগত এবং সুস্থ জীবন যাপন না করার কারণেই স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এর মধ্যে কিছু কিছু কারণ রয়েছে অরিবর্তনশীল অর্থাৎ আমাদের পরিবর্তন করতে পারি না । আবার কিছু কিছু কারণ পরিবর্তনশীল।
অপরিবর্তনশীল ঝুঁকি সমূহঃ
১. অতিরিক্ত বয়স ও বার্ধক্য
২.লিঙ্গ পুরুষের স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি
৩.জাতি আফ্রিকানদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি
৪.পারিবারিক স্ট্রোকের ইতিহাস
পরিবর্তনশীল ঝুঁকি সমূহঃ
১.উচ্চরক্তচাপ
২.ডায়াবেটিস
৩.রক্তের কোলেস্টরেল বেশি হলে
৪. ধূমপান,
৫. অতিরিক্ত ওজন বা ব্যায়াম না করা
৬. জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি দীর্ঘদিন সেবন করা
৭. কোকেন, ইয়াব্ এলকোহল ইত্যাদি
স্ট্রোক হলে কি পরীক্ষা করবেন, কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন এবং এর কি চিকিৎসা আছে
স্ট্রোক হলে কি পরীক্ষা করবেনঃ
স্ট্রোক এর লক্ষণ নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে নিকটবর্তী হাসপাতালে যেখানে স্ট্রোকের সকল চিকিৎসা সম্ভব সেখানে নিয়ে যেতে হবে।
কর্তব্যরত চিকিৎসক দ্রুততম সময়ে স্ট্রোকের লক্ষণ নিশ্চিত পূর্বক নিম্নের পরীক্ষা করবেন।
(১) সিটি স্ক্যান অফ ব্রেনঃ
এটি একটি অতি জরুরী এবং অতি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা যা আমাদেরকে স্ট্রোক এর নিশ্চিত করবে এবং স্ট্রোকের ধরন সম্পর্কে জানাতে সাহ্যয করে।
এই পরীক্ষার পরেই রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করা হয়।
(২) এম আর আই অফ ব্রেন
(৩)এম আর এ ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়
(৪)ই সি জি ইকো কার্ডিওগ্রাম
(৫)রক্তের গ্লুকোজ (সিবিসি), রক্তের চর্বি পরীক্ষা, কিডনি ইলেক্ট্রোলাইট বা লবনের পরীক্ষা, আই এন আর ও পি টি পরীক্ষা করা হয়।
স্ট্রোকের চিকিৎসাঃ
রোগীর বর্তমান অবস্থা (অক্সিজেনের মাত্রা), স্ট্রোকের ধরন( ইসকিমিক / হেমোরিজিক ) এবং অন্য অবস্থা (ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ, রক্তের রোগ) উপর ভিত্তি করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে হয়।
রোগী অজ্ঞান থাকলে সেক্ষেত্রে রোগীকে দ্রুত আইসিইউতে ভর্তি করে চিকিৎসা করার জ্রুরী।
রোগের জ্ঞান থাকলে সাধারণত ওয়ার্ড বা ক্যাবিনে ভর্তি করে যথাযথ চিকিৎসা করা হয়
বর্তমানে rTPA নামক একটি রক্তনালীর ঔষধ ব্যবহার করে স্ট্রোক রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি দেখা গিয়েছে।
যদি কোনো রোগীর স্ট্রোকের লক্ষণ দেখাদেয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই ওষুধ নিতে পারেন (যদি রোগী কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা না থাকে) তবে শতকরা ৩০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে দ্রুততার সাথে হাসপাতালে ছাড়তে পারে।
স্ট্রোকের আরোগ্য সম্ভাবনাঃ
স্ট্রোকের চিকিৎসা অন্যতম বিষয় হচ্ছে-
সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা
স্ট্রোকের সাথে অন্যান্য রোগের যেমন (উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হার্টের) এই সকল রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া।
ফিজিওথেরাপি বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত অঙ্গের যথাযথ ব্যায়াম করেনো।
এই সকল কিছু যদি পরিকল্পনা মাহফিল সঠিক ভাবে করা যায় তবে স্ট্রোক রোগীর দ্রুতই সেরে ওঠেন।বেশিরভাগ রোগী তিন থেকে ছয় মাস সময় ভালো হয়ে যান।
কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন মস্তিষ্কের ভিতরে বড় জায়গা জুড়ে স্ট্রোক করলে বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত স্ট্রোক হলে রোগীর ৪৮ প্রথম ঘন্টার মধ্যে মৃত্যু বরণ করেন।
ডাঃ মোহাম্মদ আফতাব হালিম
এম,বি,বি,এস; এম, ডি, (নিউরোমেডিসিন); এম, এস, সি, (ইউ, কে)
কনসালটেন্ট নিউরোমেডিসিন
বি,আর,বি হাসপাতাল, পান্থপথ, ঢাকা।